Tuesday, January 24, 2012

ভূপেনদা ফুলের মালা উপহার দিয়েছিলেন

৫ নভেম্বর পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন মানবতাবাদী সংগীতশিল্পী ভূপেন হাজারিকা। তাঁর প্রতি আনন্দের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় থেকে ভূপেন হাজারিকার গান শুনছি। তখন থেকেই তাঁর প্রচুর গান শোনা হতো। ১৯৭৫ সালের কথা। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করছি। আলমগীর কবির তখন সীমানা পেরিয়ে ছবিটির নির্মাণকাজ নিয়ে ব্যস্ত। একদিন জানতে পারি, ছবিটির ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানে কণ্ঠ দিতে তিনি আমাকে নির্বাচন করেছেন। তারপর উনি আমাদের বাসায় আসেন এবং আমার বাবাকে রাজি করান। তাও আবার ভূপেন হাজারিকার সুরে! এটা যে আমার জন্য কী আনন্দের ছিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। আনন্দের পাশাপাশি প্রচণ্ড ভয়ও কাজ করছিল। এরই মধ্যে ১৯৭৫ সালের একটা সময়ে বড় বোন রেবেকা সুলতানা, দুলাভাই মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, আলমগীর কবিরসহ কলকাতায় গেলাম। উঠলাম লিটন হোটেলে। সেখানে গিয়ে দেখা হয় জয়শ্রী কবিরের সঙ্গে। বিশ্রাম শেষে হোটেলে প্রথম দেখি ভূপেনদাকে। বিষয়টা তখনো অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছিল। আমাদের গানের রেকর্ডিং ছিল কলকাতার টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে। ভূপেনদার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কুশল বিনিময় করে তিনি আলমগীর কবিরের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি ঠিকভাবে গাইতে পারব কি না। আগে গানটার মানে বোঝার জন্য আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সত্যি বলতে, আমি তখন গানটার অর্থ না বুঝেই বলেছিলাম, গাইতে পারব। এরপর আমি সেদিন হোটেলে বসে গানটি শিখি এবং অর্থ বোঝার চেষ্টা করি। পরদিন স্টুডিওতে প্রথমে দুবার মহড়া করলাম, একবার মাইক্রোফোনে প্র্যাকটিস করলাম। এরপর অবশ্য দুবারেই গানটার ঠিকভাবে রেকর্ডিং সম্পন্ন হয়। গানটি রেকর্ডিংয়ের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, মালা সিনহা, সাগর সেনসহ জয়শ্রী কবিরের পরিচিত অনেকে। গানটিতে আমার সঙ্গে সেখানকার বেশ কয়েকজন শিল্পী কোরাসও করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সন্ধ্যা মুখার্জির মেয়ে। যে সন্ধ্যা মুখার্জিকে নিয়ে আসলে সব সময় স্বপ্ন দেখতাম, তাঁরই মেয়ে আমার সঙ্গে কোরাস গাইছেন! এটাতে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম। গানটি শোনার পর ভূপেনদা বেশ প্রশংসা করেছিলেন। এবং আমার গলায় একটি ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। ওনার কাছ থেকে প্রশংসা আর ফুলের মালা পাওয়ায় নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল। আর যে ভয়টা ছিল সেটা মুহূর্তেই দূর হয়ে গিয়েছিল।
এরপর আশির দশকে বেশ কয়েকবার আমরা কলকাতায় গিয়েছিলাম। প্রতিবারই ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছে। অনেক আড্ডা দেওয়া হয়েছে। আমার স্বামী রফিকুল আলমের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। উনিও দুবার ঢাকায় এসে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। সে সময় প্রচুর আড্ডা দিয়েছি। দাদা ছিলেন খুবই রসিক একজন মানুষ। যখনই কোনো আড্ডায় বসতাম, সারাক্ষণ তিনি মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে।
ভূপেনদা শিল্পী হিসেবে যেমন ছিলেন অনেক বড় মাপের, মানুষ হিসেবে ছিলেন আরও অনেক বড় মাপের। কলকাতায় যখন আমি ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটি গাইতে যাই, তখন হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়ি। তিনি চিকিত্সক ডেকে আমাকে স্যালাইন দিয়ে ওষুধপথ্য খাইয়ে সুস্থ করে তোলেন। চোখ মেলে দেখি, ভূপেনদা আমার পাশে বসে আছেন। বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করে। পরে শুনেছিলাম, আড়াই ঘণ্টা উনি এভাবেই বসে ছিলেন।
সীমানা পেরিয়ে ছবির গানটি করার পর ওনার সঙ্গে আরও কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু পরে ওনার ব্যস্ততা আর আমার গাফিলতির জন্য তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শেষের ১০-১২ বছর দাদার সঙ্গে আর কোনো ধরনের যোগাযোগই হয়নি। তবে মাঝে কয়েকবার ফেসবুকে ওনাকে পেয়েছিলাম। সেখানেই অল্প কিছুক্ষণের জন্য দু-একবার আলাপ হয়। সর্বশেষ মাস তিনেক আগে উনি জানতে চেয়েছিলেন, কবে আমি কলকাতায় যাচ্ছি। আমি বলেছিলাম, এই ডিসেম্বরেই আসছি। এটিই ছিল ভূপেনদার সঙ্গে আমার শেষ কথা।
পরে অবশ্য ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ গানটি ভূপেনদা লং প্লেতেও করেছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি যতবারই গানটি করেছিলেন, প্রতিবারই আমার নাম উল্লেখ করতেন। উনি আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন, আদর করতেন। এককথায়, উনি একেবারেই অন্য রকম একজন মানুষ ছিলেন। ওনার সঙ্গে আড্ডা দিলে কথায় কথায় কখন যে সময় পার হয়ে যেত, সেটা টেরই পেতাম না।

No comments:

Post a Comment